অনীক আব্দুল্লাহ আমান

একদিন ভাঙ্গা বাসের সিটে বসে আমি ঠিক করলাম দেশ পালটাবো। বাড়ি ফিরে যা যা কিছু নিজের বলা যায়, সব গুছানো শুরু করলাম। দু সপ্তাহর মাঝে ‘ভিসা লাগেনা’ আর ‘নাম উচ্চারণ করতে পারিনা’ এমন একটা দেশের টিকেট কেটে রওনা দিলাম।
ভিনদেশে এসে একটা হোটেলে উঠলাম। হাবভাব দেখে ধারণা করলাম থ্রি স্টার হোটেল হবে। হোটেলের রিসেপশনিস্ট ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি জানেন। যদিও মনে মনে চাচ্ছিলাম সেটাও না জানতেন। এটা অবান্তর চাওয়া। উনি ইংরেজি না জানলে- বা কোনো ভাবে যোগাযোগ করতে না পারলে রুম কি করে নিতাম? তবে ভাষা না জেনে কি কেউ কোনো দিন হোটেল ভাড়া করেন নি? অবশ্যই করেছেন। তবে উনার সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম এ দেশের লোকেরা ইংরেজি কম জানেন। এই হোটেলে আপাতত কিছুদিন থাকা যাবে।
পরদিন সকালে উঠে নিচে নাস্তা করতে গেলাম। দেখি গতদিনের সেই রিসেপশনিস্ট। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি জানার বদৌলতে উনি আমার সাথে যোগাযোগ করতে চাচ্ছেন। কোথা থেকে এসেছি, কি জন্য এসেছি, কতদিন থাকব - এরূপ অবান্তর প্রশ্ন। তার প্রশ্নের জবাব দিলে তেমন ক্ষতি নেই। চেহারা দেখেই বুঝা যায় আমি কোন দেশের লোক। বললাম এমনি এসেছি। কতদিন থাকব ঠিক নেই। তার সাথে কথা বলে বুঝলাম এই এলাকায় এমনি ঘুরতে ফিরতে লোক কম আসেন। তাই আমার উত্তরে তিনি রীতিমত অবাক। সেজন্যই হয়ত নিজের কৌতুহল মিটাতে তিনি ঠিকমত প্রফেশনাল হতে পারছেন না। পরে আবার মনে হল প্রফেশনালিজমের কন্সেপটটা একেক কালচারে একেক রকম। এই দেশে অতিথিদের একা ফেলে রাখাকে খারাপ হিসাবেও দেখা হতে পারে। যদি সেটা হয়- তা আমার জন্য হতাশাজনক। তবে আমি বিশ্বাস করি কালচার যেমনি হোক- তার মাঝে থাকা লোকজন সবাই এক না। রিসেপশনিস্টকে আমার খারাপ লাগে না। তাও এখানে বেশিদিন থাকা যাবে না। উনি অতিরিক্ত কৌতুহলী। কৌতুহল সংক্রামক রোগের মতন। রিসেপশনিস্ট থেকে যে কয় দিন আছি একটু দূরে দূরে থাকাই ভাল।
সারাদিন পুরা এলাকা হেঁটে বেড়ালাম। এলাকায় আমার মতন দেখতে মানুষ নেই। তাও লোকজনের সেরকম উদ্ভট নজরের শিকার হই নি। দুপুরে রাস্তার পাশে এক রেস্টুরেন্টে গিলাম। মেনুতে যা আছে এর একটাও আমি পড়তে পারিনা। তাই আশেপাশে এক টেবিলের ভদ্রলোক যা খাচ্ছেন তা দেখিয়ে সেটা আকার ইঙ্গিতে বললাম আমাকেও দিতে। বিল পরিশোধ করার সময় বিপত্তি ঘটলো। হোটেলে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবস্থা আছে বলে টাকা পয়সা সংক্রান্ত ঝামেলায় পড়তে হয়নি। কিন্তু রাস্তার পাশের একটা রেস্টুরেন্টে সে ব্যবস্থা না থাকা অতি স্বাভাবিক। ওয়েটারকে পকেটের তলা থেকে বের করে কিছু ডলার ধরিয়ে দিতে গেলাম। চেহারা দেখে বুঝলাম উনি অনেক বিরক্ত হয়েছেন। উনি কি বললেন কি বলেন কিছুই বুঝি না আমি। তাই খালি ধারণাই করতে হচ্ছে। ধারণা করলাম কাঁচা ডলার দিলে তাদের সেটাকে আবার ভাঙ্গায় নিজ দেশের টাকা বানাতে হবে- সে জন্য হয়ত বিরক্ত হলেন। আমাকে উনি রেস্টুরেন্টের সামনে নিয়ে আসলেন। আমি ভাবতে থাকলাম এই বুঝি রান্নাঘরে নিয়ে এখন থালাবাসন ধোয়াবেন। সামনে যাওয়ার পর দেখলাম উনি ভেতর থেকে ম্যানেজারকে নিয়ে আসছেন। ম্যানেজার অর্ধেক ইংরেজিতে অর্ধেক অন্যকোন ভাষা আর আকার ইংগিতে যা বললেন তার সারমর্ম করলে দাঁড়ায়, ওয়েটার ডলার নিতে পারেননি, কারণ এখানে কেউ ইংরেজি সংখ্যার সাথেও পরিচিত নন। উনি কিছুটা পরিচিত। তাই আপাতত এর সুরাহা করা সম্ভব হচ্ছে।
ঝামেলা চুকিয়ে হোটেলে ফেরত আসলাম। হোটেলে আগের রিসেপশনিস্ট নেই। যিনি আছেন উনি আমার কথা বুঝেন না। ভাষা না জানার ফলে লোকজনের সাথে যোগাযোগ উলটা বেশি করতে হচ্ছে। কম পক্ষে আর কিছু শিখি বা না শিখি এ দেশের সংখ্যাগুলো চিনতে হবে। পৃথিবীর সব দেশে অ্যারাবিক নিউমেরালস চলে। শিখতে বেশি সমস্যা হবার কথা না। ক্রেডিট কার্ড আর পকেটের তলার ডলার গুলো দিয়ে বেশি দিন চলবে না।
চার-পাঁচ দিন হয়ে গেল। পুরানা রিসেপশনিস্টের দেখা পাচ্ছি না আর। তার কাছ থেকে এখানে চলতে টুকটাক দরকারি কিছু জিনিস শিখে রাখতাম। এদিকে হোটেলেও আজীবন থাকা যাবে না, অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। ভাষা না জেনে একলা একলা বাসা খুঁজে পাওয়াও মুশকিল। আমি তাই সেই রিসেপশনিস্টের অপেক্ষা করতে থাকি।
প্রায় দু সপ্তাহ পর (আসলে ১৬ দিন, দিনের হিসাব রেখেছি সেটা স্বীকার করতে লজ্জা হচ্ছিল।) রিসেপশনিস্টের সাথে দেখা হয়। সে আমাকে দেখে অবাক হয়, এত দিন এই এলাকায় পরে আছি। তাই আপাতত এখানে থাকার জন্য বাসা ভাড়া খুঁজছি, সেটা জানাই না। তার কাছ থেকে জানতে পারি, এই হোটেলটা তার চাচার। সে পাশের শহরে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। এলাকায় ফেরত আসলে সে হোটেলের রিসেপশনে বসে। আরও দুই-চারদিন সে এখানে আছে।
ঐ ঘটনার পর থেকে আমি আর বাইরে কোথাও খেতে যাইনি। হোটেলেই খাওয়া দাওয়া করতাম। সেদিন রাতে আমি রিসেপশনিস্টকে আমার এই শহরে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা জানাই। আর বলি আমাকে এই এলাকার টুকটাক বেসিক নিয়ম আর সংখ্যা পদ্ধতি শিখিয়ে দিতে। ভাষা শিখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নেই, সেটাও তাকে জানিয়ে দেই। বুঝি যে আমি থেকে যাচ্ছি কেন তা নিয়ে রিসেপশনিস্ট খুবই কৌতুহলী। কিন্তু এবার তিনি এই নিয়ে তেমন প্রশ্ন করেন না। বলেন তিনি আমাকে এ নিয়ে সাহায্য করতে আগ্রহী। আমি ধারণা করি তিনি নিজ চোখেই দেখতে চান যে আমি কি করি। উনি যা ইচ্ছা ভাবুক, আমাকে বেশি প্রশ্ন না করলেই হল।
পরদিন আমি বেলা হয়ে যাওয়ার পরেও ঘুমাচ্ছিলাম। রিসেপশনিস্ট এসে আমাকে বলে যান, উনি এলাকায় কিছু খালি বাসার খোঁজ পেয়েছেন। চাইলে এখনই যেতে পারি, লোকজন এমনিও বেশি আসেনা এখানে। পাশের দোকানের কাউকে হোটেলে কিছুক্ষণের জন্য বসতে বলেন যাবেন। আর না চাইলে বিকালেও যেতে পারি। আমি তাকে বললাম, আমি এখনই যেতে চাই। একটু অপেক্ষা করতে পারলে এখনি প্রস্তুত হয়ে নিচে আসছি।
তার সাথে বাসা বাড়ি দেখতে রওনা দেই। রিসেপশনিস্ট বলেন- আমি ভিনদেশি দেখে বাড়িওয়ালারা বাসা ভাড়া নাও দিতে পারেন। সেজন্য যেন আমি হতাশ না হই। সে সারাদিন ফ্রি আছে, সময় নিয়ে বাড়ি খোঁজা যাবে।
ওর কথা মত আমার কাছে প্রথম দুই বাড়িওয়ালাই ফেরত পাঠিয়ে দিলেন। উনারা কি বললেন তা সংক্ষেপে রিসেপশনিস্ট আমাকে বুঝিয়ে বলে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাদের দুই জনেরই একই কথা। তারা কেউ রেসিস্ট নন, বা ভিনদেশি বলে আমাকে ঘৃণা করছেন না। কিন্তু একে অপরের এক বর্ণও না বুঝতে পারলে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। আমি মনে মনে ভাবছিলাম, বাড়িওয়ালার সাথে কি এমন শখের আলাপ করব যে ভিন্ন ভাষার লোককে তারা ভাড়া দিতে পারছেন না। মাস শেষে উনি ভাড়ার টাকাটা পেলেই তো হচ্ছে।
রিসেপশনিস্ট এলাকার মানুষ বলে এখানকার সবাইকে কম বেশি চিনেন। তৃতীয় বাড়িতে যাওয়ার আগে সে বলে নেয়, এই বাড়ির ভদ্রলোক একটু অদ্ভুত। কিন্তু মানুষ হিসেবে ভাল আছেন। উনি আমাকে বাড়ি ভাড়া দিতে রাজি হতে পারে। ভেতরে ঢুকে রিসেপশনিস্টের কথা ধরতে পারি। উনি আমাদের দেখে, সোজা ভাড়া দেওয়ার ঘর গুলোতে নিয়ে যায়। পুরো মুহূর্তে কোনো কথা বলেন না। কোনো প্রশ্ন করলে তিনি আগে থেকে নোট করে রাখা ছোট কার্ড ধরিয়ে দেন। আমি নোটে লেখা কিছু পড়তে পারিনা। রিসেপশনিস্ট আমাকে পড়ে বুঝিয়ে দেয়। ভদ্রলোককে জানানো হয় আমি এই দেশের ভাষা কিচ্ছু বুঝি না। উনি স্টিকি নোটে খশখশ করে লিখে তা রিসেপশনিস্টের হাতে দেয়। রিসেপশনিস্টের ভাষ্যমতে ওখানে লেখা আছে “কোনো সমস্যা নেই। উনার পাঁচ ভাষার ডিকশোনারি আছে।”
বাড়িটা আমার পছন্দ হয়। ছোট ছোট দুই রুম। শুরুর ঘরে রান্নাঘর আর ডাইনিং। আর ভিতরে একটা বেডরুম। আমার দিব্যি চলে যাবে। ভদ্রলোককে কথা দিয়ে আসি আমি এই বাড়ি ভাড়া নিচ্ছি। আর ক’দিনের মধ্যেই উঠে যাব। কাগজ পত্রের ঝামেলা আগামীকাল এসে মিটিয়ে যাব। উনি আরেকটি স্টিকি নোট ধরিয়ে দেন। সেখানে উনি আমাদের আশ্বাস দেন, তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। রিসেপশনিস্টকে চিনেন বিধায় আমি দুই চার দিন সময় নিতে পারি।
ফেরার পথে রিসেপশনিস্টকে বলি, ভদ্রলোক অনেক ইন্টারেস্টিং চরিত্র। উনি কি কথা বলতে পারেন না?
সে জানায়, পারে , মানে, ভদ্রলোক উলটা গান গেয়ে বেড়ায়। প্রতি রবিবার সকালে, বারান্দায় বসে উনি গান করেন। সপ্তাহে এতটুকুই তার কথা বলা। বাকি সময় যা বলা দরকার ঐ কার্ডে কার্ডে লিখেই চালিয়ে যান।
শিফট করার মত আসবাবপত্র কিছুই ছিল না আমার। কিন্তু নতুন বাসায় থাকতে হলে কিছু আসবাব পত্র লাগত। রিসেপশনিস্ট বলেন তার অতিরিক্ত বিছানাপত্র আমি চাইলে নিতে পারি। আমাকে একটু বিব্রত হতে দেখলে সে আরও যোগ করে, এগুলো তার পুরানো আসবাবপত্র, অনেকদিন ব্যবহার হয় না। কাজে না আসলে আর কিছু দিন পর ফেলে দিতে হবে। আমি নিলে তাও কাজে লাগবে। আমার দেখে ভাল লাগলে যা প্রয়োজন মনে করি নিয়ে যেতে পারি।