অনীক আব্দুল্লাহ আমান

আমি যখনই কাউকে বলি আমি পশুপাখির ভাষা বুঝি আর তাদের সাথে কথা বলতে পারি, সবাই আমাকে পশুপাখিকে দিয়ে যা-তা করিয়ে দেখাতে বলে। কিন্তু আমি তো কেবল পশুপাখিদের সাথে কথা বলতে পারি। তাই বলে যে সে আমার কথা রাখতে বাধ্য এমন কিছু তো না। তাই আমি যখনই বলি আমি পশুপাখির ভাষা বুঝি, কেউ আসলে আমাকে বিশ্বাস করে না।

কেউ কেউ জানতে চাইতে পারেন পশুপাখির ভাষা বোঝা বাস্তব জীবনে কোনো জটিলতার সৃষ্টি করে কিনা। আসলে আমি বেশ প্রিভিলিজড জীবন-যাপন করি। তাই দৈনিন্দিন জীবনে দু-একটা বাদে সেরকম ঝামেলায় পড়তে হয়নি। এখন এটা ঠিক, যখন রাতের বেলা ঝিঝি পোকার ডাকে ঘুম আসে না, কিংবা ভোর সকালে পাখির ডাকাডাকি শুনি- আমি সেগুলার অর্থ বুঝতে পারি। তাদের এসব ডাকাডাকির অধিকাংশই সঙ্গী খোঁজার ডাক। এতে যে আমার কাছে পাখির ডাক বিব্রতকর লাগে, এরকম কিছু না। আমি এটাকে আমাদের প্রেম-ভালবাসার গান-বাজনার সাথে তুলনা করি। অনেক গানই প্রেম-ভালবাসার কথা বলে। এতে তো গান শুনতে খারাপ লাগে না। আমি এত কথার দিকে খেয়াল রেখে কখনই গান শুনিনি।

অনেকের ধারনা পশুপাখির সাথে কথা বলতে পারলেই তাদের সাথে খাতির করা যায়। আমি জানিনা, হয়ত তারা কথা বলতে পারলে বন্ধুত্ব করতে পারত। আমি খুব একটা পারিনা। কিছু কিছু মানুষকে পশুপাখিরা খুব একটা পছন্দ করে না। আমিও ওরকম একজন মানুষ। আমার ধারণা আমাকে সবচেয়ে অপছন্দ করে আমার পাশের বাড়ির বিড়াল, বেবি। কোনো বিশেষ কারণ নেই, ও এমনেই আমাকে অপছন্দ করে। বেবি তার দত্তক প্রদত্ত নাম। সে নিজেকে এই নামে পরিচয় দেয় না। বেবি-এর স্ট্রিট নেম স্যামুয়েল। তাকে এলাকার সবাই ওই নামেই চিনে। সাধারণত পশুপাখিদের জন্য ফোনেটিক্যাল নামকরণ আমাদের মতন গুরুত্বপুর্ণ হয়না। কিন্তু মানুষের মাঝে বেড়ে ওঠা পোষাপ্রাণীগুলোর মাঝে একটু পার্থক্য দেখা যায়।

স্যামুয়েলের সাথে যদি আমার কখনও কথা-বার্তা না হত তাহলে সে আমাকে সবচেয়ে অপছন্দ করে বলে দাবি করতে পারতাম না। কাউকে অপছন্দ করতে হলে তাকে কিছুটা হলেও চিনতে হয়। স্যামুয়েলের গলায় ছাপা অক্ষরে ‘বেবি’ লেখা বেল্ট ঝোলে। তার সাথে আমার প্রথম কথা হয় এই বেল্টটা নিয়েই। ওকে বেবি সম্বোধন করে বলি বেল্টটা বেশ সুন্দর। সে চমকে যায়। আমি কোথা থেকে এই নাম জানলাম, কে জানালো, তার বাড়িওয়ালাকে চিনি কিনা এই সব বিষয়ে প্রশ্ন করা শুরু করে। আমি তাকে বেবি ডাকায় সে বেশ বিরক্ত হয়। ও আমাকে জানায় তাকে যেন এই নামে না ডাকি। ‘বেবি’ নামে তাকে কেবল তার খুব কাছের লোকেরাই ডাকার অধিকার রাখে। তার নাম স্যামুয়েল। তাকে যেন সে নামেই ডাকা হয়। তাকে আমার যেকোনো নামে ডাকতেই কোনো আপত্তি ছিল না, তাই আমি মেনে নেই। আসলে স্যামুয়েল বাদে আমার অন্য প্রাণীদের সাথে নিয়মিত কম কথা হয়। তাই তারা আমাকে পছন্দ বা অপছন্দ করে কিনা বুঝতে পারিনা।

অন্য পশুপাখিরা সাধারণত খুব ব্যস্ত থাকে। তাই তারা খুবই একটা পাত্তা দেয়না। একবার একটা ইঁদুরকে দেখে বলি— “এ ভাই, অনেক দিন ধরেই এই এলাকায় আছেন দেখছি। একটু নাম-পরিচয় বিনিময় করা যাক।” তখন সে ইঁদুর ঝাটা মেরে উত্তর দেয়— যে ভরা পেটে আরাম করে লেপের নিচে ঘুমায়, সে তার ভাই না।

এ কথা দুই বাস স্টপ পার হয়ে চায়ের দোকানের কুকুরকে বললে সে আমাকে জানায়, যে সবার বন্ধু, সে আসলে কারই বন্ধু না। আমি ওকে বলি, কিন্তু আমি তো ওদের কারই বন্ধু নই। সবার বন্ধু হলাম কখন?

কুকুরটা বলে সে তো তাই বলেছে। সে বলেছে যে আমি ওদের বন্ধু না। ও ভুল বলেনি। সবার সাথে কথা বলতে পারার এই ঝামেলা- কথা-বার্তার রেটরিক সবসময় ধরতে পারিনা।

এরপর কুকুরটা জানায় ওরও আসলে তেমন বন্ধু নেই। ওর অন্য কুকুরদের সাথে সম্পর্ক এলাকা ভিত্তিক রাজনৈতিক হায়ারার্কির আর মানুষের সাথে সম্পর্ক খাবার ভিত্তিক। ওর সাথে কথা বলে আমার থেরাপিস্টের কথা মনে হতে থাকে। ওকে এক প্যাকেট বিস্কিট কিনে দেই। কুকুরটা তার কথা ও কাজে স্বচ্ছ। তাই তাকে আমার পছন্দ হয়।

আমার পাখিদের মধ্যে কাকদের অনেক বুদ্ধিমান মনে হয়। কিন্তু তারা নিজেদের সমাজের বাহিরে কারও সাথে মেলামেশা করে না। তাই তাদের সাথে খুব বেশি স্মরণীয় কথাবার্তা নেই। আর এমনিতেও পাখিদের যাপন খুবই ব্যস্ত ধরনের। তাদের আকাশে উড়ে বেড়ানো দেখে যতটা স্বাধীন মনে হয়, তাদের রুটিনড জীবন-যাপন দেখে আমার ততই শৃঙ্খলবদ্ধ মনে হয়। ভোর হবার আগেই কাজে বের হয়ে যেতে হবে, আবার সন্ধ্যার মধ্যেই বাড়ি ফেরত। এসেই ঘুম। এত মাপা সময়ের লোকদের সাথে তাই দু এক লাইনের বেশি কথা বলা যায় না। প্রতি সন্ধ্যায় কাকদের আলোচনা দূর থেকে শুনে এলাকার খুব সাধারণ খবরগুলো বারবার জানতে পারি। মাঝে দু-একটা অদ্ভুত কথা ভেসে আসে, যদিও সেগুলাতে আমার তেমন কিছু যায় আসে না।

সন্ধ্যার নাস্তা করে জানালার পাশে বসলে প্রতিদিন স্যামুয়েলের সাথে দেখা হয়। জানালার পাশেই আমার কাজ করার টেবিল। তাই ঘুমাতে না গেলে পুরো সময় আমাকে ওখানেই পাওয়া যায়। সারাক্ষণ আমাকে দেখতে হয় বলেই হয়ত স্যামুয়েল আমাকে অপছন্দ করে। স্যামুয়েল জানালার আশেপাশে রাতের খাবারের সময় অব্দি ঘুরঘুর করে। এরপরে সে যথারীতি তার ‘বাড়িওয়ালার’ কাছে খাবার খেতে যায়। খাওয়ার সময় হলে সে অনায়াসেই ইটের দেয়ালের মাথায় উঠে যায়। দেয়ালের উপরে দেওয়া কাঁটাতার গলে সে নড়বরে গাছের ডালে চড়ে বসে। ডাল ধরে কিছু দূর আগানোর পর সে একটা খালি এসির কোটরের নাগাল পায়। ওখানে উঠে এক লাফ দিলেই সে তার বাসার বারান্দায় পৌঁছায়। স্যামুয়েলের বাসার বাতি অনেক রাত অব্দি জ্বলে। আমি যখন রাত জেগে বসে থাকি, আস্তে আস্তে সব বাড়ির বাতি বন্ধ হয়ে যায়। খালি স্যামুয়েলের বাড়ির বাতি জ্বলতে থাকে। তখন নিজেকে সে বাসার লোকদের সাথে কানেক্টেড মনে হতে থাকে।

একদিন সন্ধ্যায় স্যামুয়েলকে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাস করি- কি অবস্থা? স্যামুয়েল জানায় সে রাশার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি যেন তাকে এখন বিরক্ত না করি। স্যামুয়েল এরপর আমাকে আর পাত্তা দেয়না। আমার তখন নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কালীন একটা ঘটনা মনে পড়ে।

আমার সেসময় একজনের সাথে কথা হত। তাকে আমার বেশ ভাল লাগত। আমার কথার প্রত্যুত্তর তার খিল-খিল হাসি শুনলে মনে হত আমার আর কিছু না শুনলেও চলবে। কল্পনা করতাম কিভাবে তার অ্যাফারমেশনগুলো নিয়ে বয়ামজাত করে রেখে দেওয়া যায়। তাহলে আমার বাকি জীবন তাই জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে- আর কিছু করে না করেই কাটিয়ে দিতে পারব। নতুন নতুন কারও প্রতি আবেগ জন্মালে যা হয়। তখন সবচেয়ে অদরকারি অনুভূতিগুলোকেও রোম্যান্টিসাইজ করা যায়।

স্যামুয়েলের বান্ধবী রাশা এখনও আসেনি। রাশাকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনিনা। তবে সে কোন বিড়াল হতে পারে তা ধারণা করতে পারি। আমি আবার আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ভাবতে থাকি।

একদিন সে তার পোষা কুকুরকে নিয়ে হাঁটতে বের হওয়ার সময় জিজ্ঞাস করে আমি তাকে সে সময় সঙ্গ দিতে চাই কিনা। আমি অবশ্যই রাজি হই। সেদিন আমার তার কুকুরের সাথে প্রথম দেখা হয়। দেখা হওয়ার পরই সে আমার দিকে লক্ষ্য করে বলে, হারামজাদা কি চাস? আমি খুবই অবাক হয়ে যাই। আমি আগেও বলেছি আমাকে পশুপাখি অপছন্দ করে। কিন্তু এভাবে আগ বাড়িয়ে তখনই প্রথম কোনো প্রাণী আমাকে পারসোনালি গালি দেয়। তাই রীতিমত থতমত খেয়ে যাই। আর বিষয়টা আরও ক্রিপি ছিল, কারণ তার কথা না বুঝলে এমনি চেহারা ভঙ্গি দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে সে আমাকে রীতিমত ঘৃণা করে।

মেয়েটার সাথে আমি সেদিন যতটা সময় ছিলাম পুরোটা সময় জুরে ওর কুকুর আমাকে একটার পর একটা হুমকি দিয়ে গেল। সে নির্দ্বিধায় বলে গেল আমাকে একলা পেলে কিভাবে টুকরে ফেলবে। কিভাবে আমার শ্বাসতন্ত্র থেকে কণ্ঠনালী এক কামড়ে আলাদা করে ফেলবে। আর বাড়ির ঠিক কোন কোন জায়গায় আমার হাড়গুলো পুঁতে রাখবে। মেয়েটা হাঁটা শেষে সেদিন তার বাড়িতে যাওয়ার দাওয়াত দিয়েছিল। কিন্তু কুকুরটার কথায় অস্বস্তিতে পড়ে আমি মেয়েটাকে অর্ধেক পথে রেখে ফেরত চলে আসি।

আমি যে পশুপাখির ভাষা বুঝি তা মানুষরা বিশ্বাস করেনা। তাই আর কাউকে না পেয়ে দু প্যাকেট বিস্কিটের বিনিময়ে আমি চায়ের দোকানের কুকুরের সাথে এ ঘটনা শেয়ার করি। ও আমাকে কয়েকটা থিউরি দেয়। প্রথমত ভিনদেশি কুকুর হওয়ায় তার ব্যবহার করা ইডিওম, বাগধারা ইত্যাদি আলাদা হতে পারে। কিন্তু তাও সে কুকুর এত কথা বলেছে ওই হিসেবে তার ন্যারেটিভের এসেন্স সে আমাকে বুঝাতে পারার কথা। দ্বিতীয়ত তার ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে। তৃতীয়ত ভিনদেশি কুকুর হওয়ায় তার ন্যারেটিভে সাবজেক্টগত অসামঞ্জস্য থাকতে পারে। যেটাই হোক, আমি আর চায়ের দোকানের কুকুর দুজন মিলে এটাই বুঝতে পারি যে আমি মেয়েটার বাসায় যাই সেটা তার পোষা কুকুর চায় না।

আমার মেয়েটাকে কখনই বলা হয় না আমি পশুপাখির ভাষা বুঝি। এটাও বলা হয়না তার কুকুর আমাকে অপছন্দ করে। আর তার কুকুরের প্রতি আদিখ্যেতা দেখে বুঝতে পারি- আমার আর তার কুকুরের মাঝে সে তার কুকুরকেই বেছে নিবে। এটা আমার একই সাথে স্বাভাবিক আর কমিকাল মনে হতে থাকে। এ মুহূর্তে কেন যেন মেয়েটাকে নিয়ে আর খুব বেশি ঘটনা মনে পড়ে না।

যখন ওর সাথে আমার সম্পর্কের ইতি হয়, তখন চায়ের দোকানের কুকুরটার কাছে একটা পুরো প্লেইন কেকের বিনিময়ে কান্নাকাটি করি। সে বলে, যে মানুষের ঘরের কুকুর বেয়াদব, তারও ভাল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। আরও সময় গেলে সেটা আমি ঠিকঠাক টের পেতাম। অল্পের মাঝেই আমি বেঁচে ফেরত এসেছি।