অনীক আব্দুল্লাহ আমান
দুপুরে ভাত ঘুমের ছুতোয় সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সিলিং দেখছিল। আর ভান করছিল যেন আকাশ দেখছে। আকাশে অনেক মেঘ- শাদা শাদা। যাই কল্পনা করে, মেঘগুলো তাই হয়ে যায়। আর চিন্তা করছিল সে একটা গাছ হলে বেশ ঝামেলায় পড়তে হত। গত সাত দিন বা পনের দিন; ধুর, দিনের হিসাব বাদ দেই। ধরে নেই অনেক দিন। অনেক দিন ধরে সে বাড়ি থেকে বের হয় না। বাড়ি থেকে বের হয়ে কোনো কাজ নেই। বাড়ির ভেতরেও যে খুব কাজ আছে এমনও না। বাড়ির ভেতরে আলোও আসে না। আলো ছাড়া লোকে দিব্যি ভাত-তরকারি খেয়ে বাঁচে। কিন্তু গাছ তো ভাত খায় না। নাহ, সে ভাবে, গাছ হলে বেশ ঝামেলাতেই পড়তে হত।
এরপর সে আরও ভাবতে থাকে।
জগদীশ চন্দ্র বসু যখন গাছের প্রাণ আছে প্রমাণ করেন, কি মনে করে প্রমাণ করেন? আর কিসের প্রেক্ষিতে? সে অনেক ট্যাঞ্জিবল প্রশ্ন ভেবে ফেলে। এখন চাইলে ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে একটা উত্তর পাওয়া যাবে। সেটা আলশেমির জন্য আর করতে ইচ্ছা হয় না। তাই সে পরে নিজের মত কিছু চিন্তা করে ভেবে নিবে বলে ঠিক করে। আপাতত এ বিষয় রেখে সে গাছের প্রাণের কথা ভাবতে থাকে।
আপনারা কি জানেন মাটির উপরে সবচে বড় জীব আসলে অনেকগুলো গাছের কলোনি। অ্যাস্পেন গাছ। মাইল-কে-মাইল জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। আমাদের প্রোটাগোনিস্ট এই গাছের কথা জানত, কিন্তু কখনও সেটার নাম মনে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। তাই সে নাম-ছাড়া কেবল গাছের ক্যারেক্টারিস্টিক নিয়ে ভাবতে থাকে। সবগুলো গাছ একই রুট-সিস্টেমে যুক্ত। আর সে কলোনিতে প্রতিটা গাছ নাকি একটা-আরেকটার ক্লোন। এরকম একটা গাছ হলে কেমন হত?
এরকম একটা গাছ হতে হলে তাকে কি পুরো কলোনিটা হতে হতো? নাকি যে কোনো একটা গাছ হয়ে থাকার অপশন থাকতো? আর সে কলোনিতে প্রতিটা গাছ কি নিজেদের একে অপরের যমজ ভাই-বোন হিসেবে দেখে? নাকি শিকড়যুক্ত কলোনিতে কখনও ইন্ডিভিজুয়ালিজম থাকে না?
“না, ভাই। গাছ হলে ভালোই ক্যাচাল হত।” সে বিরবির করে বলে।
কিন্তু সে ভাবে সব গাছ তো আর নিজের ক্লোনের সাথে হাত ধরাধরি করে থাকে না। যেমন ধরেন, আম গাছ? সেটা হলে কেমন হতো? বনে-বাদারে গাছের কমিউনিটির মাঝে রুট সিস্টেম থাকে। সে রুট সিস্টেম ধরে তারা ‘যোগাযোগ[’ করে বা ইন্টারনেট সোশালিস্টদের মতে তারা বিনা লাভে ‘রিসোর্স’ শেয়ার করে। আমাদের প্রোটাগোস্টিটের কাছে এত কেমিক্যাল মারপ্যাচের সামাজিকীকরণ পছন্দ হয় না।
সে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে কল্পনা করে সে একটা মানিপ্ল্যান্ট গাছ। যাকে একটা পানির বোতলে রাখা হয়েছে। এইতো সেদিন তার আরেকটি নতুন শিকড় গজালো। বোতলের বাহিরে তার কাছে আর কিছুর কোনো অর্থ নেই।
এদিকে বোতলের পানি আবার অনেক দিন ধরে পালটানো হয় না। সেখানে মশার ডিম ফুটে লার্ভা সাঁতার কাটে। মশার লার্ভাগুলো প্রেডিক্টেবল ছন্দে গিজগিজ করতে থাকে। মানিপ্ল্যান্ট গাছ সে ছন্দের মোহে পড়ে যায়; আর ভাবতে থাকে সে ধুধু মাঠের মাঝে একটা আম গাছ। আশেপাশে আর কোনো গাছ নেই। সে মাটির গভীরে-পাশে-চারদিকে শিকড় ছড়িয়ে দেয়। বছর বছর ধরে সে শিকড় ছড়াতে থাকে। এক বছর - পাঁচ বছর - কয়েক শ’ বছর। না কিচ্ছু নেই। এরপর আম গাছের কেমন লাগে?
মশার লার্ভাগুলো একে একে সব মশা হয়ে উড়ে যায়। রোদের অভাবে মানিপ্ল্যান্টের পাতাগুলো হলুদ হতে থাকে। “তাও ভালো”, মানিপ্ল্যান্ট বিরবির করে বলে, “ভাগ্যিস এই প্লাস্টিকের বোতলের বাহিরে কিছু নেই। নতুবা আমগাছ থাকলে ওর একটা ক্যাচালে পড়া লাগত।”
(সিলিং-এর মেঘগুলোর বদলে ঝুল চোখে পড়তে থাকলে আমাদের প্রোটাগোনিস্ট ভাবে—আগামীকাল দুপুরে সে ফার্ন হলে কেমন হবে তা ভেবে দেখবে।)