অনীক আব্দুল্লাহ আমান

ছাদে বসে রাস্তার ব্রেক পেডালে চাপা গাড়িগুলোর লাল বাতি দেখছিলাম। রাস্তাটা বাড়ির সামনে দিয়ে সোজা চলে গেছে, শেষ মাথা একটা বিন্দুতে গিয়ে মিলেছে। রাস্তার সব লেন জুড়ে খালি গাড়ির লাল বাতির ঝিকমিক দেখা যাচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে এমনটা দেখতে পারার কথা না। কিন্তু আজ স্বাভাবিক সময় না।

“ওমা আপনি গেলেন না?”

“যাইনি বলা ভুল হবে। আসলে যেতে পারিনি।” আমি তার দিকে ভাল করে না তাকিয়েই প্রশ্নের উত্তর দিলাম। আবার রাস্তার দিকে মনোযোগ দিলাম।

“আমি সিল্ভিয়া, এই বাসার তিন তলায় থাকি। আমাকে হয়ত চিনেন না, আমাদের আগে কখনও কথা হয়নি।”

এমন ভাবে তার নাম-পরিচয় শুনলাম, যেন প্রথম বারের মত শুনছি। সত্যি বলতে আমি তার নাম-পরিচয় জানতাম। বাসাটা বেশ ছোট, এক ফ্ল্যাটের শব্দ অন্য ফ্ল্যাটে; এক তলার শব্দ অন্য তলায় চলে যায়। অনেকবার তার বাসা থেকে তাকে নাম ধরে ডাকতে শুনেছি। তাকে কখন খেতে ডাকতো, কখন না ঘুমানোর জন্য বকতো, সবই কানে আসতো। কখনও যে পরিচিত হতে ইচ্ছে হয়নি- তা বললে মিথ্যা কথা বলা হবে। তবে সেটা মনে হয়েছে খুবই অল্প সময়ের জন্য। কোনো সিজোনাল ঠান্ডা জ্বরে কাত হয়ে পরে থাকার সময়- যখন যাবতীয় অদরকারি জিনিস ভাবলে মাথা ব্যথা করে। তাও নানা ভাবনা আসে। সেরকম এক সিজোনাল জ্বরে মনে হয়েছিল দুনিয়ার যাবতীয় সুন্দর মানুষদের জানিয়ে দেই তারা সুন্দর। পরবর্তীতে এরকম নির্থক বুদ্ধি যেন মাথায় না আসে তাই ঠান্ডা-জ্বর থেকে বেঁচে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাই।

সেরকম এক ঠান্ডা জ্বরে তার সাথে পরিচিত হবার ইচ্ছা জেগেছিল। শুধু তার সাথে না, অপরিচিত-পুরোনো পরিচিত বহু মানুষের সাথেই যোগাযোগ করার কথা ভেবেছিলাম। শেষ মেশ এসবের কিছুই করা হয়না। আমার ধারণা এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করিনি বলেই এমনটা হয়েছে। দরকারি মনে হলে সাধারণত সেসব কাজ আজ হোক বা কাল করা হয়।

কিন্তু আজ তো আমি তার সাথে পরিচিত হচ্ছি। তাহলে কি তা দরকারি ছিল? আমি কি আমাদের এই কনভার্সেশন গুরুত্বপূর্ণ মনে করি? যদিও একটা কনভার্সেশন খালি আমার গুরুত্বপূর্ণ মনে করবার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

অন্য কোন দিন হলে আমরা হয়ত কথাই বলতাম না৷ সে ছাদে এসে ঘুরে চলে যেত। হয়ত জিজ্ঞাস করত কেমন আছি, তাও কেবলই ভদ্রতা করে। আজ সে যে ভদ্রতা করে কথা বলতে আসেনি, তা বোঝা যাচ্ছিল। আমিও তাকে নিজের নাম পরিচয় দিলাম।

তাকে বললাম, “আপনি যাতে এখন ছাদে এসে বসেছেন, তাহলে ধরে নিচ্ছি আপনিও যেতে পারেননি। নিশ্চয়ই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করেছেন না।”

সিলভিয়াও আমার মত রাস্তার গাড়িগুলোর ঝিকমিক লাল বাতি দেখছে। সে আমার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিল, “না, আমিও যেতে পারিনি। আমাদের পরিবারে বাবার চাকরি সূত্রে মাত্র একটি টিকেট পেয়েছিলাম। সেটা আমার ছোট ভাইকে দিয়ে দিয়েছি। জানিনা সে পৌঁছাতে পেরেছে কিনা।”

আমি ওকে কি বলে সান্ত্বনা দিব বুঝতে পারছিনা। আসলে তেমন কিছু বলার নেই। আমার মনে হচ্ছে না সে সান্ত্বনা পাওয়ার জন্য কথাটি বলেছে। বলেছে কেবলই একটি ফ্যাক্ট হিসাবে। সে অনেক আগেই যা হবার তা মেনে নিয়েছে। আমরা অনেকদিন ধরেই জানতাম কি হতে চলেছে। আগামীকাল আমাদের এই গ্রহের শেষ দিন। যার যার সামর্থ্য আছে সবাই ইতোমধ্যে পৃথিবী ছেড়ে গেছে। বাদ বাকি দুই-একটা মহাযান ফেলে গেছে আমাদের মত ‘অগুরুত্বপূর্ণ’ লোকদের বুঝ দিতে। তারা লটারির আয়োজন করেছিল- আমি লটারি পর্যন্ত কিনতে পারিনি। স্টক আউট হয়ে গিয়েছিল। সেটা মাস ছয়েক আগের কথা। এতদিনে সব হজম হয়ে গেছে।

আমি আর সিল্ভিয়া আমাদের বাড়ির ছাদে বসে আছি। দুইজনই এই বাড়িতে ভাড়া থাকি। বাড়িওয়ালা বাড়িতে নেই। আমার ধারণা তিনি এতক্ষণে মহাজানের জানালা থেকে আমাদের গ্রহটাকে নীল মার্বেলের মত দেখছে। উনি কি আমাদের জন্য, আমাদের গ্রহের জন্য হাহাকার অনুভব করছে? নাকি টিকেট হাতে বুক ফুলিয়ে জয়ীর বেশে বসে আছেন? আমি হলে জয়ী জয়ী অনুভব করতাম না। এইজন্য না যে আমি সুবিধাবঞ্চিতদের দুঃখে মহাবিষণ্ণ। আমার কাছে যে মহাযানে সবাই টিকেট পেয়ে ‘জয়ী’, সেখানে তা নিয়ে নিজেকে সেরা ভাবার কিছু নেই। তুলনা করার এই খারাপ দিক। নিজের থেকে খারাপ অবস্থায় কেউ যেমন আছে, অনেক ভাল অবস্থায় আছে এমন লোকজনেরও কমতি নেই।

কোনো পার্ফেট দুনিয়াতে আমার সিলভিয়াকে বলার মত এমন অনেক কিছুই থাকত যা পৃথিবীর শেষ দিনের সাথে সম্পর্কিত না। কিন্তু দুনিয়া পার্ফেক্ট না। আমাদের মাঝের নীরবতা ভাঙ্গতে আমি বললাম,

“ওরা কেউও পৌঁছাতে পারবে না। সারা রাস্তা জুড়ে জ্যাম।”

সিল্ভিয়া সম্মতিতে মাথা নাড়লো। বলল, “আমার ধারণা তাদের সবার কাছে টিকেটও নেই। তাও শেষ চেষ্টা করে দেখছে।”

“আমার মনে হয়না সবসময় চেষ্টা করা উচিত। আর ১৪-১৫ ঘন্টা বাকি আছে, ঐ সময়টা আমি রাস্তায় কাটাতে চাইনা।”

“কি জানি। আমিও তো আজীবন কিছু না কিছুর পাওয়ার জন্য চেষ্টা করে গেছি। কখনও পড়ালেখা-কখনও চাকরি। কিন্তু দেখেন, রাত ফুরানোর পরেই সব হাওয়া হয়ে যাবে। কি নিরর্থক!”

“আমিও একই কাজ করেছি কিন্তু তাও সময় নষ্ট করেছি বলে মনে করিনা। আমার সত্যি বলতে জীবনে আর তেমন কিছু করার ছিল না। অন্য ভাবে অন্য কিছু করলে দুনিয়ায় স্বর্গীয় আনন্দে থাকতাম, এটা আমি বিশ্বাস করিনা।”